বুধবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন
নোটিশ
তান্ডব চালিয়ে মৃত্যু ঘটিয়ে শান্ত হল ঘূর্ণিঝড় ‘হামুন’
/ ৪
প্রকাশিত সময় : বুধবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৩, ৪:৪৭ অপরাহ্ন

এনএনবি : বিদ্যুৎবিহীন কক্সবাজারে তান্ডব চালিয়ে উপকূল পেরিয়ে গেছে ঘূর্ণিঝড় ‘হামুন’। যাওয়ার আগে প্রাণহানির যেমন ঘটিয়েছে, তেমনি লন্ডভন্ডের মুখে পড়েছে শহর ও গ্রামের অনেক এলাকা। শত কিলোমিটার গতিবেগের এই ঝড়ে বসতবাড়ি ধসে পড়ার পাশাপাশি গাছপাল উপড়ে গেছে।
সাগরে জলোচ্ছ্বাস আর প্রবল ঝড়ো বাতাসের মধ্যে সন্ধ্যার কিছু পরেই আঘাত হানে বঙ্গোপসাগরে শুরু হওয়া ঘূর্ণিঝড় হামুন। মঙ্গলবারের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে তা পরদিন আঘাত হানার শঙ্কার কথা উঠে এলেও তা গতিপথ বদলে এদিন সন্ধ্যার পরেই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে। পরে রাত ১টার দিকে এটি শান্ত হয়ে স্থল নি¤œচাপে পরিণত হয়।
আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড় উপকূলের কাছাকাছি এলে ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। সাগরে জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়। জেলার উপকূলজুড়ে প্রায় পৌনে তিন লাখ বাসিন্দাকে তীরবর্তী এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় আশ্রয়কেন্দ্রে। ঝড়ের গতিবেগ বাড়তে থাকলে অনেকস্থানে গাছপালা ভেঙে পড়ে। এমন খবরে আগাম সতর্কতা হিসেবে বিদ্যুৎ বন্ধ শহর ও উপজেলায়।
ঘূর্ণিঝড় হামুন উপকূল অতিক্রম করার শুরুর দিকেই ঝড়ে বিপুল সংখ্যক গাছপালা এবং কাঁচা ও আধাকাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। ৮০ কিলোমিটার গতিবেগে আঘাত হানলেও এক পর্যায়ে ঝড়ের গতিবেগ শত কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। কক্সবাজারে রাত ৮টায় ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ১০৪ কিলোমিটার পর্যন্ত রেকর্ড হয় বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘর ধসে পড়ার খবরের পাশাপাশি ছোট-বড় সাইনবোর্ড ভেঙে পড়ে থাকতে দেখার খবর দিয়েছেন স্থানীয়রা। জেলার বেশিরভাগ এলাকায় সন্ধ্যা থেকেই বিদ্যুৎ নেই।
ঘূর্ণিঝড় কুতুবদিয়ার পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় পাশের উপজেলা মহেশখালীতেও প্রভাব ছিল বেশ। প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনেও ঝড়ের প্রভাব ছিল। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ মেলেনি।
ঝড়ের তা-বে কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলীতে মাটির দেওয়াল চাপায় একজন এবং মহেশখালী উপজেলায় গাছচাপায় একজনের মৃত্যুর খবর এসেছে। এছাড়া দেয়াল চাপা ও গাছপালা পড়ে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার পর থেকে ঘূর্ণিঝড় হামুন কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানা শুরু করে। এরপর একটানা রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূল ও এর আশপাশের অঞ্চল দিয়ে ব্যাপক ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। একই সঙ্গে শুরু হয় বজ্র বৃষ্টি।
শহরের প্রধান সড়কে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরসহ অনেক এলাকায় ঝড়ের আঘাতে গাছ উপড়ে পড়ে। এতে সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। বিদ্যুতের খুঁটি ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষতি হয়েছে বলেও খবর এসেছে।
শহরে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বলেন, “আমার বয়সে এমন ঝড় দেখি নাই। কীভাবে ঘর থেকে বের হইছি তা বলে বোঝাতে পারব না।”
ঘূর্ণিঝড় এত বেশি জোরে আঘাত হানবে তা চিন্তাতেও ছিল না বলে মন্তব্য করেন পৌর শহরের আতঙ্কিত এক নারী।
সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। তবে গতিবেগ খুব বেশি না হওয়ায় খুব বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার খবর আসেনি।
রাতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান দুইজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন। কক্সবাজার শহরের সমিতি পাড়া কুতুবদিয়া পাড়াসহ জেলার উপকুল এলাকায় ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
বুধবার ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় দিনভর জেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার তথ্যও তুলে ধরেন তিনি।
কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মো. মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ঝড়ে পৌরসভার সমিতি পাড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুরো শহরে অনেক গাছপালা ভেঙে গেছে। প্রায় শতাধিক কাঁচা-পাকা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। একজন দেয়াল চাপায় মারা গেছেন।
তিনি জানান, ঝড় কিছুটা কমে এলে রাতে অনেককে উদ্ধার করা হয়। পাশের পাহাড় থেকে অনেক বাসিন্দাকে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রতিটা ওয়ার্ড ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ খবর নিচ্ছেন কাউন্সিলররা। এছাড়া সড়কের ওপর ভেঙে পড়া গাছ অপসারণে কাজ চলছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে পৌরসভার পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে বলেও জানান পৌর মেয়র।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সৈকতে বিপদ সংকেতের অংশ হিসেবে পর্যটকদের সতর্কতা হিসেবে মাইকিং করা হয়েছে। এ ছাড়া সৈকতে দায়িত্বরত লাইফ গার্ড কর্মীরা পর্যটকদের নিরাপদে থাকতে মাইকিং করেছে।
এর আগে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন দুপুরে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্হাপনা কমিটির সভা করে। উপকূল এলাকায় লোকজনদের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে মাইকিং করে। রাত পর্যন্ত পৌনে তিন লাখ মানুষক আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানিয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘হামুন’ এর গতিপথ ঘুরে যাওয়ায় কয়েক জেলার মানুষকে আর আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়নি। মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত ১১ জেলার দুই লাখ ৭৩ হাজার ১৫২ জন মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও সংবাদ
ফেসবুক পেজ